Menu
Menu

কুল মরিয়াদ কপাট উদঘাঁটলু

গোবিন্দদাস । অভিসার

কুল মরিয়াদ কপাট উদঘাঁটলু

তাহে কি কাঠলি বাধা। 

নিজ মরিযাদ সিন্ধু সঞে পঙারলুঁ 

তাহে কি তটিনী অগাধা।। 

সজনি মঝু পরিখন কার দূর। 

কৈছে হৃদয় করি পন্থ হেরত হরি 

সােঙরি সােঙরি মন ঝুর।। 

কোটি কুসুমশর বরিয়ে যছু পর 

তাহে কি জলদজল লাগি।

প্রেমদহন দহ যাক হৃদয় সহ

তাহে কি বজরক আগি।।

যছু পদতলে নিজ  জীবন সােঁপলু 

তাহে তনু অনুরােধ। 

গোবিন্দদাস কহই ধনি অভিসর 

সহচরী পাওল বােধ।।

আলােচনা

গােবিন্দদাস-কৃত এই পদটিতে প্রচণ্ড দুর্যোগের মধ্যেও রাধার গাঢ় প্রেমবশতঃ সঙ্কেতকুঞ্জে প্রতীক্ষারত নায়কের সঙ্গে মিলনের উদ্দেশ্যে অভিসারগমনের দৃঢ় সঙ্কল্প ঘােষিত হয়েছে। কৃষ্ণপ্রেমের কারণে রাধা অভিসারে যেতে উদ্যত হয়েছেন। সে মুহূর্তে একজন সখী ভীষণ প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে তাকে যেতে বারণ করছেন। এর উত্তরেই রাধার এত যুক্তির অবতারণা। 

আরো পড়ুন :  সই কেবা শুনাইল শ্যামনাম

রাধার যুক্তি– কুলমর্যাদারূপ কপাট যিনি উদঘাটন করছেন, সামান্য কাঠের দরজা তাঁকে আর কতটুকু বাধা দিতে পারে? নিজ মর্যাদারূপ সিন্ধু যিনি অতিক্রম করেছেন, তাঁর কাছে নদী পার হওয়া কিছুই নয়। সখী যেন তাকে পরীক্ষণ থেকে বিরত হয়। কারণ রাধার এখন সবরকম পরীক্ষা থেকে অনেক উর্দ্ধে। বরং পরম দয়িত কৃষ্ণ যে সঙ্কেতকুঞ্জে এসে তার জন্য প্রতীক্ষার নিদারুণ যন্ত্রণা ভােগ করছেন, এটা স্মরণ করেই রাধার মন কাঁদছে। আর প্রাকৃতিক দুর্যোগ রাধাকে আর কিই বা বাধা দেবে ? কোটি কোটি পুষ্পশর যার ওপর বর্ষিত হচ্ছে, তার গায়ে কি বৃষ্টির জল লাগে ? প্রেমের আগুন যার হৃদয়কে নিরন্তর দহন করছে, বজ্রপাতের আগুন তার কি করবে? আর সখী যে তাঁকে দৈহিক নিরাপত্তার কথা বলছেন, তাও অর্থহীন। কারণ জীবন-সর্বস্বের রাধা নিজেকে সমর্পণ করেছেন। তাঁর এখন দেহাবশে বিলুপ্ত। তাই তাঁকে তনুরক্ষার বিষয়ে অনুরােধ করা বৃথা। কারণ নিজের বলতে তাে রাধার এখন কিছুই নেই– দেহ বা গেহ কিছু নয়। একমাত্র শ্রীকৃষ্ণ ছাড়া। সুতরাং তাঁর সঙ্গে মিলন-পিয়াসী রাধা এখন কোনাে বাধাকেই বাধা বলে মনে করেন না। পদকর্তার উত্তিতে রাধাকে অভিসারগমনে অনুরােধ এবং সহচরীর বােধ জাগ্রত হওয়ার কথা ধ্বনিত হয়েছে।

আরো পড়ুন :  দাঁড়াইয়া নন্দের আগে  গােপাল কান্দে অনুরাগে

আলােচ্য পদটিতে রাধার যুক্তিগুলি গােবিন্দদাসের আর একটি পদ “মন্দির বাহির কঠিন কপাট” পদে বিধৃত সখীর নিষেধসূচক উক্তিগুলির প্রত্যুত্তর। সুতরাং এইরূপ উক্তি-প্রত্যুক্তির মধ্যে চরিত্রদ্যোতনা ও নাটকীয়তার সৃষ্টি হয়েছে। নাটকীয়তার বিশেষ লক্ষণ দ্বন্দ্ব ও কৌতূহল এখানে যথেষ্টই উপস্থাপিত। এ দুটি পদ গীতিকবিতা হিসেবে রচিত যদি না হােত, উক্তি-প্রত্যুক্তিগুলাে ক্রম অনুসারে সাজিয়ে দেওয়া হােত, তাহলে একটি নিটোল নাটাদৃশ্য হিসেবেও তা পরিগণিত হতে পারত।

error: Content is protected !!