Menu

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে চৈতন্যদেবের প্রভাব আলোচনা কর

যিনি জন্ম সূত্রে রাজপুত্র কিংবা রাষ্ট্রীয় বর্গের বিত্তবান উত্তরাধিকারী নন। সাহিত্যের বিস্তৃত পটে যিনি বিলাস অবকাশ যাপন করতে পারেন নি। কয়েকটি শ্লোকের সমষ্টি শিক্ষাষ্টক মাত্র যাঁর সম্পদ কলমের আঁচড়ে সাহিত্য ভাণ্ডারে সঞ্চয় প্রবণতা মুক্ত যে নৈয়ায়িক পণ্ডিত তিনি কেমন করে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে যুগন্ধর ব্যক্তিত্ব হয়ে রইলেন তাঁর আর্বিভাবের
[9:01 pm, 30/08/2022] sukhen: মধ্য দিয়ে কেমন করে মেঘাচ্ছন্ন বাংলার আকাশে দেখা দিল জ্যোর্তিময় আলোর অভ্যর্থনা ? মানব মহিমার মাঙ্গলিক শঙ্খধ্বনির অনুরণন শোনা গেল সমাজ সংসারের সাহিত্যের রন্ধ্রে রন্ধে? কেমন করে ব্যক্তির ধর্মাদর্শ বিশ্বমনের মহামন্ত্র আর রাষ্ট্রীয় শিক্ষা সংস্কৃতি কৃষ্টির অভিনব স্বর্ণ সঞ্চয় হয়ে যায় সেই আলোচনাই হলো বাংলার সাহিত্যের ইতিহাসে চৈতন্যদেবের প্রভাব।

প্রতিটি দেশের প্রতিটি মহান ব্যক্তিত্ব বা যুগ প্রতিনিধির স্মরণীয় কীর্তির পিছনে তাঁকে সমাজ দেহের পটভূমির একটা তাগিদা। চৈতন্যের আবির্ভাবের কালে বড়ো দুঃসময়ের: আঁধার দুর্যোগের। ভাতার, তুর্কী, খোরাসানি প্রভৃতি মরু পর্বতবাসী ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের শারীরিক বল, রনোন্মদন। হিংসা কোলাহল হত্যা লুগুন, নারী ধর্ষণের পাশবিকতা বাংলা দেশে লোমহর্ষক দুঃস্বপ্ন ঘুলিয়ে তুলেছিল।

অবশেষে হোসেন শাহের সিংহাসন লাভের ভিতর দিয়ে শান্তি ফিরে আসে এবং এই ঘটনার আট বৎসর পূর্বে চৈতন্যদেব নবদ্বীপে জন্ম গ্রহণ করেন। নির্বাপিত দ্বীপ আবার জ্বলে উঠলো। চৈতন্যদেব প্রভাবিত সাহিত্য মধ্যযুগের ভাব ভাবনা ও সংস্কারের দ্বারা লালিত হলেও তাতে জনজীবনের পদধ্বনি শোনা গেল প্রথম। বিষয়টি অনেক দিক দিয়ে য়ুরোপের রেনেশাঁসের সমতুল্য বলে ঐতিহাসিকগণ এই পর্বকে চৈতন্য চরণে শাঁস বা চৈতন্য পরবর্তিত “নবযুগ” আখ্যা দিয়েছেন।

কিন্তু কোন্ বিশেষ কারণে যুগটি “চৈতন্য যুগ” নামে সম্মানিত হতে পারে? প্রকৃত পক্ষে চৈতন্যদেব বিদ্রোহী সত্তা। হিন্দু-মুসলিম সংস্কারের বিধায়কগণ যখন নিজ নিজ সমাজ ও ধর্মের সীমানা সংরক্ষণের অতি মাত্রায় ব্যস্ত ছিলেন— সেই সংকীর্ণ সংরক্ষণশীলতার সর্বগ্রাসী রাষ্ট্রীয় আবর্তের মাঝখানে উপেক্ষিত মানবের মানবতাকে সামনে তুলে ধরে প্রীতি চোখে তাকাতে চেয়েছিলেন বলেই চৈতন্যদেবের বিদ্রোহ প্রাণহীন শাস্ত্র বচনের বিরুদ্ধে হৃদয়ের বিদ্রোহ, সঙ্কীর্ণ স্বার্থ বুদ্ধির বিরুদ্ধে শ্রেয়বোধের বিদ্রোহ, তাঁর এই উদারতার জন্যই তাঁর ধর্ম সম্পূর্ণ নতুন আলোকে নতুন রূপে প্রতিভাত হয়।

চৈতন্যদেবকে আমরা ধর্মজীবনের প্রতিভূ হিসাবে চিহ্নিত করতে পারি; যিনি সেই চিরাচরিত ধর্মীয় সংস্কারের বহিরাবরণটিকে দীর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। অথবা তাঁকে ঐতিহাসিক যুগসন্ধির নায়ক হিসাবে মর্যাদা দিতে পারি যিনি বিদেশী আক্রমণে হতচকিত; ভীতসন্ত্রস্ত অথবা শ্রেণী সংগ্রামে বিধাগ্রস্ত, অপ্রকৃতিস্থত সমাজ জীবনে ফিরিয়ে এনেছিলেন আত্মসাধিত এবং ম বোধ। কিন্তু ধর্মগুরু সংস্কারক ঐতিহাসিক যাই বলিনা কেন সর্বোপরি তিনি ছিলেন এক মুক্ত মতি পুরুষ। তাই তিনি কেবল আধিভৌতিক প্রকাশ্য জগতের সঙ্গে গোপনচারী জীবনের মেল বন্ধনেই ঘটালেন না— তিনি মানুষের সঙ্গে মানুষের হাত মিলিয়ে দিলেন সুপ্ত প্রেমের রাখী বন্ধনে। সে মানুষ হোক না কেন বিধর্মী বিজাতীয় অথবা নিপীড়িত অন্ত্যজ সম্প্রদায়ের পরিত্যক্ত সন্তান। তাই তিনি অখণ্ড পরিপূর্ণ মানুষ। বাস্তবিক পক্ষে এই পরিপূর্ণতার ছোঁয়া লেগেই মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্য হয়ে উঠেছে মানুষের জয়গান।

তাঁর আর্বিভাবে বাংলা সাহিত্যে সূচিত হয়েছে দুটি স্পষ্ট যুগবিভাগ। তাঁর ব্যক্তিত্ব সমাজ ও সাহিত্যদর্শকে নিয়ন্ত্রণ করেছে নিম্নোক্ত তিনটি উপায়ে (ক) ধর্মগুরু বা সাম্প্রদায়িক নায়ক হয়েও তিনি বাঙালির ধর্মীয় সংস্কারের কঠিন আবরণকে

ছিন্ন করেছেন। বাঙালি হয়েছে তথাকথিত ধর্মীয় সংস্কার ও সংকীর্ণতামুক্ত। (খ) অনভিজাত লোকধর্ম ও গণচেতনা তার ব্যক্তিত্বের যাদুস্পর্শে অভিজাত ও উচ্চতর জীবন মহিমায় প্রতিষ্ঠিত হবার সুযোগ পেল, ফলে দ্বিধাবিভক্ত সমাজজীবনে এল পারস্পরিক সমন্বয় ও মিলনাকাঙ্ক্ষার তীব্র আবেগ।
[9:01 pm, 30/08/2022] sukhen: (গ) তাঁর দিব্য আবির্ভাবে বাঙালি খুঁজে পেল এক পরিপূর্ণ মানবীয় আদর্শ। সাধারণ মানুষের অবচেতনে মানবত্ব সম্পর্কে যে চিরন্তন ধারণা ও আদর্শ সেই প্রেম প্রীতি ভালোবাসা উন্নততর নৈতিক চেতনা ও আত্মবিশ্বাস সর্বপোরি আত্মপ্রকাশের বিস্মিত বেদনা তা যেন মূর্ত হয়ে উঠল এই একটি জীবনকে কেন্দ্র করে।

বলাবাহুল্য জীবনের এই শূন্যবোধ সাহিত্যে স্বাভাবিক ভাবে প্রতিবিম্বিত হয়েছিল। তাই বাংলা সাহিত্যকে প্রাকচৈতন্য ও চৈতন্যত্তোর পর্যায়ে বিভক্ত না করে পারি না।

চৈতন্যত্তোর যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ উন্নয়ন ঘটেছে সেসব ক্ষেত্রে তার তিনটি দিক হলো (i) উন্নত ও পরিশীলিত রুচিবোধ।

(ii) ভক্তিরসের মাদকতা

(iii) বাংলা সাহিত্যের বিভাগীয় বৈচিত্র

আদর্শের ক্ষেত্রে কিরকম পরিবর্তন ঘটেছিল তার উদাহরণ মঙ্গলকাব্য। চৈতন্যপ্রভাবে মঙ্গলকাব্যের দেবদেবীরা ক্রুরদানবীয় গুণসম্পন্ন হয়ে পড়ে— “শত্রু মিত্র একভাব” তাই অন্নদামঙ্গলের অন্নদার কাছে।

শ্রী চৈতন্য সমাজে যে ভাব বিপ্লব এনেছিলেন তার প্রভাব মুদ্রিত হলো পদাবলী সাহিত্যে। প্রাক-চৈতন্যযুগে রাধাকৃষ্ণ বিষয়ক যে সমস্ত পদ রচিত হত তাতে মানব মানবীয় পার্থিব প্রেমই ছিল মূল বিষয়। কিন্তু চৈতন্য প্রভাবে যে গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের বিকাশ ঘটলো তার প্রভাব

পড়লো চৈতন্য পরবর্তী পদাবলী সাহিত্যে। গৌরচন্দ্রকে নিয়ে ভক্তিবিহ্বল চর্যারঙ্গ বিষয়ক পদ বা ‘গৌরচন্দ্রিকা’ রচিত হলো। এই

পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ পদকার গোবিন্দদাস, জ্ঞানদাস ও বলরাম দাস নিজ নিজ স্বাতন্ত্রে উজ্জ্বল। এই

সাহিত্যর বিকাশকে ‘চৈতন্য সংস্কৃতি’ আখ্যা দেওয়া হয়।

চৈতন্য আর্বিভাবে সম্পূর্ণ নতুন যে দিকটি উন্মোচিত হলো সেটি হচ্ছে জীবনী সাহিত্য।

বৃন্দাবন দাস, কৃষ্ণ দাস কবিরাজ, জয়ানন্দ এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য জীবনীকার। আর অনুবাদ সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটলো চরিত্রে। রামায়ণের রাক্ষস বর্বর দুধর্ষ রাবণ রামভক্ত পরম বৈষ্ণবে পরিণত হয়।

সর্বোপরি চৈতন্য আর্বিভাবে বাংলাসাহিত্যে রচনার পরিধি বিস্তৃত থেকে বিস্তৃততর হলো। প্রকৃতপক্ষে বৈষ্ণব গৌড়ীয় দর্শন ভাবনা লোকায়ত করার উদ্দেশ্যে বাংলা সাহিত্যে তত্ত্বমূলক আলোচনা অথবা সাধন সঙ্কেতময় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নিবন্ধ বা ‘কড়চা’ জাতীয় রচনার তাগিদ দেখা গেল। এর ফলে কাব্যের ভাষা অনেকক্ষেত্রে হয়ে উঠেলো গদ্য সর্বস্ব এবং নিরলংকৃত। এই বিবরণমূলক কথা সর্বস্ব রচনার উপযুক্ত বাহন ও অক্ষরবৃত্তের ছন্দের “শোষক’ শক্তি। সুতরাং মনে করা যেতে পারে বাংলা গদ্যের প্রাথমিক ইতিহাস চৈতনোত্তর যুগের রচনার উপাদানেই নিহিত আছে।

বলা বাহুল্য চৈতন্যলীলার কেন্দ্রস্থল সেই নবদ্বীপ / নদীয়া শাসিত গৌড়ভূমি হয়তো সেই যুগ থেকেই আদর্শ ভাষায় কেন্দ্রাঞ্চল রূপ চিহ্নিত হতে আরম্ভ করেছিল।

পরিশেষে বলা চলে বাঙালির হিয়া অমিয় মথিয়া যে নিমাইয়ের কায়া গঠিত হয়েছিল- তা তো ভাগবতের উদার মন্ত্রে দীক্ষিত সমাজ বাস্তবতার হাত ধরেই তার ঢেউ লেগেছিল। সাহিত্যে। তাই বাংলা ভাষায় সাহিত্যে সমাজ-সংস্কৃত গড়ে উঠেছিল তা ভেবে বাঙালি হিসাবে বলতে বাধা নেই—“প্রেম একবার মাত্র পৃথিবীতে রূপ গ্রহণ করেছিল তা বাংলাদেশে”।।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

error: Content is protected !!